সানাজানা তালুকদার, কুবি প্রতিনিধি
মাত্র দেড় মাস আগেও যাদের জীবনের বড়ো অংশ জুড়ে ছিল স্কুল, কলেজ আর পরিচিত শহরের চেনা পরিবেশ, তারা এখন জীবনের নতুন এক অধ্যায়ে যাত্রা শুরু করেছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতেই পেয়েছে নতুন বন্ধু, নতুন ক্লাসরুম, নতুন আড্ডা আর নতুন নতুন সব গল্প।
সকল প্রথম কিছুর অভিজ্ঞতা অর্জন শেষে অবশিষ্ট থাকা প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ছেড়ে ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফিরছে তারা। তাই বাড়ি ফেরার আনন্দের পাশাপাশি কাজ করছে এক ধরনের অদ্ভুত শূন্যতাও–মাত্র দেড় মাসেই যে ক্যাম্পাস আর মানুষগুলো যেন নিজেদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, তাদের ছেড়ে যাওয়ার অনুভূতিটাও এখন বিশেষ মাত্রায় রূপ নিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুটা সাধারণত অনেক অচেনা মানুষের ভিড়ে নিজের মানুষ খোঁজার গল্প। শুরুতে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে দ্বিধা, সংকোচ কিংবা অস্বস্তি থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটিই হয়ে ওঠে প্রতিদিনের অভ্যাস। ক্লাস শেষে টং দোকানের আড্ডা, একসঙ্গে ক্যাম্পাসে ঘুরে–বেড়ানো, বিভাগের নতুন বন্ধুদের সঙ্গে গল্প-আড্ডা; সব মিলিয়ে কয়েক মাসেই গড়ে ওঠে অন্যরকম এক সম্পর্ক।
২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য এবারের ঈদ শুধু পরিবারে ফেরার আনন্দ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রথমবার বিশ্ববিদ্যালয়কে পেছনে রেখে যাওয়ার অনুভূতি। অনেকের কাছে বাড়ি ফেরার উত্তেজনা থাকলেও ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ার আগে মন খারাপও কাজ করছে। কেউ বন্ধুদের মিস করার কথা বলছে, কেউ আবার ভাবছে ঈদের পর ক্যাম্পাসে ফিরে আবার সবাইকে একসঙ্গে পাওয়ার মুহূর্ত নিয়ে, আবার কেউ বলেছেন ক্যাম্পাসের সুন্দর প্রকৃতির কথা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুতেই তৈরি হওয়া এই আবেগগুলো হয়ত ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু পরবর্তীতে এগুলোই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। প্রথমবার ক্যাম্পাস ছাড়ার অনুভূতি, প্রথম ঈদের ছুটি আর ফিরে আসার অপেক্ষা–সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি এক নতুন আবেগের গল্প।
মার্কেটিং বিভাগের মাহজাবিন আফরিন বলেন, ‘ওরিয়েন্টেশনের পর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এটাই আমাদের প্রথম ছুটি। তাই বাড়ি ফেরাকে ঘিরে অনেক উৎসাহ কাজ করছে। পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা হবে–এই আনন্দ যেমন আছে, তেমনি প্রিয় ক্যাম্পাস আর প্রিয় বন্ধুদের ছেড়ে যাওয়ার কারণে মন খারাপও লাগছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে ক্যাম্পাসের প্রতিটি আঙিনা যেন নিজের হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি মিস করবো নতুন বন্ধুদের এবং গাছে গাছে ফুটে থাকা অসংখ্য ফুলকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ক্লাস শুরুর পর প্রতিদিন নতুন নতুন বন্ধু বানানোর অভিজ্ঞতাটাও ছিল দারুণ। এখন তাদের সঙ্গে এতটাই মিশে গেছি যে কিছুদিন আগেও যে, তাদের চিনতাম না, সেটাই অবিশ্বাস্য মনে হয়। তারা এখন আমার দ্বিতীয় পরিবার হয়ে উঠেছে। ঈদের পর আবার ক্যাম্পাসে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে আগের মতো আড্ডা দিতে এবং কৃষ্ণচূড়া, জারুল ও সোনালু ফুলে সাজানো ক্যাম্পাসটিকে আবার দেখতে মুখিয়ে থাকবো।’
একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মাইনুল হোসেন সারুফ বলেন, ‘বাড়ি ফেরার অনুভূতি আসলে সবসময়ই অন্যরকম। যারা দীর্ঘ সময় বাড়ির বাইরে কাটিয়ে আবার বাড়িতে ফিরে, তারা এই অনুভূতিটা ভালোভাবে বুঝতে পারে। এটি সবসময়ই আনন্দের। তবে বাড়িতে আসার পর ক্যাম্পাসের কোলাহল, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর ঘুরাঘুরি, এসব অনেক বেশি মিস করছি। বিশেষ করে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং সিনিয়রদের সঙ্গে আড্ডার মুহূর্তগুলো সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সবার সঙ্গে অনেক ভালো বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে; এখন মনে হয় যেন সবাই একটা পরিবারের অংশ। তাই সবাইকে খুব মিস করছি।’
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের আয়েশা আক্তার পাখি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম ঈদে বাড়ি ফেরা আমার কাছে এক অন্যরকম অনুভূতি। অনেকদিন পর পরিবারের মানুষদের কাছে ফিরে এসে খুব ভালো লাগছে। দীর্ঘদিন বাড়ির বাইরে থাকার কারণে পরিবারের গুরুত্ব আরও গভীরভাবে অনুভব করতে পারছি। শুরুতে বাড়ি যেতে পারব কি না, তা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা ছিল। তবে যখন নিশ্চিত হলাম যে আমিও বাড়ি ফিরতে পারব, তখন সত্যিই অনেক ভালো লেগেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বেশি যেটা মিস করব, সেটা হলো আমার বন্ধুরা। অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। আমরা একে অপরের পাশে থাকি, তাই সবাইকে এখন খুব মিস করছি। ঈদের পর ক্যাম্পাসে ফিরে আবার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়া, আড্ডা আর ক্যাম্পাসের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো উপভোগ করার অপেক্ষায় থাকব।’
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম ঈদে বাড়ি ফেরার অনুভূতি সত্যিই অনেক বিশেষ ও আনন্দের। স্কুল-কলেজ জীবনে সবসময় পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপন করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রথমবারের মতো দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়েছে। তাই ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার মুহূর্তটা অনেক বেশি আবেগের হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি থাকলেও পরিবারের সবার সঙ্গে আবার দেখা হবে, এই ভাবনাটাই সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়। বিশেষ করে মা-বাবার সঙ্গে সময় কাটানো, ছোট ভাই-বোনদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া এবং নিজের পরিচিত পরিবেশে ফিরে যাওয়ার অনুভূতিটা অনেক স্বস্তির।
তিনি আরো বলেন, ‘বাড়ি ফেরার আনন্দটাই সবচেয়ে বেশি কাজ করছে, তবে ক্যাম্পাস ছেড়ে আসার সময় কিছুটা মন খারাপও হয়েছে। কারণ দেড় মাসের মধ্যেই নতুন বন্ধুদের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। একসঙ্গে ক্লাস করা, আড্ডা দেওয়া, ক্যাম্পাসে সময় কাটানো, এসব খুব দ্রুতই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে গেছে। তাই কিছুদিনের জন্য বন্ধুদের ছেড়ে আসার বিষয়টাও খারাপ লাগছে। আবার ঈদের পর ক্যাম্পাসে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, সবাই মিলে ঈদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করা এবং আগের মতো ব্যস্ত জীবনে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় আছি।’