ইবি প্রতিনিধি
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আল-ফিকহ্ অ্যান্ড ল’ বিভাগে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে মাদ্রাসা ও কলেজ ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত ৫০:৫০ অনুসারে ভর্তিনীতি বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। অনুমোদিত নীতিমালায় সমান হারে শিক্ষার্থী ভর্তির বিধান থাকলেও চলমান গুচ্ছ ভর্তি কার্যক্রমে সেই শর্ত অনুসরণ করা হচ্ছে না।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ৭ ডিসেম্বর ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে আল-ফিকহ্ অ্যান্ড ল’ বিভাগে মাদ্রাসা ও কলেজ ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০:৫০ অনুপাতে আসন বণ্টনের সিদ্ধান্ত হয়। তবে চলমান ভর্তি কার্যক্রমে ওই নীতির বাস্তবায়ন হয়নি। বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ভর্তির জন্য টাকা জমা দেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই কলেজ ব্যাকগ্রাউন্ডের। ফলে অনুমোদিত নীতিমালার সঙ্গে বাস্তব চিত্রের বড় ধরনের অমিল দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট টেকনিক্যাল কমিটি জানায়, আল-ফিকহ্ অ্যান্ড ল’ বিভাগে এ ইউনিট থেকে ৩২ জন, বি ইউনিট থেকে ৪০ জন এবং সি ইউনিট থেকে ৮ জন শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তবে বিজ্ঞপ্তিতে মাদ্রাসা ও কলেজ শিক্ষার্থীদের সমান বণ্টনের কথা উল্লেখ থাকলেও ইউনিটভিত্তিক আসন বণ্টনের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় হিসাব নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে পরবর্তী মাইগ্রেশন প্রক্রিয়া থেকে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হবে।
এ বিষয়ে বিজ্ঞান ইউনিট থেকে বিভাগটিতে ভর্তির সুযোগ পাওয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, “ভর্তি নির্দেশিকায় মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০ শতাংশ হারে আসন বরাদ্দের বিষয়টি দেখেছিলাম। যদি পরে সেই শর্ত পরিবর্তন হয়ে থাকে, তবে তা শিক্ষার্থীদের প্রতি অন্যায় হবে। ভর্তির ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্ত দেখিয়ে পরে তা বাস্তবায়ন না করা প্রতারণার শামিল। কারণ শিক্ষার্থীরা নির্দেশিকায় উল্লেখিত শর্তের ভিত্তিতেই সাবজেক্ট চয়েস দিয়েছে।”
গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য এবং ইবির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ-এর অধ্যাপক ড. নাছির উদ্দিন খান বলেন, “বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। কেন্দ্রীয় কমিটিকে অবগত করা হয়েছে। পরবর্তী মাইগ্রেশনে সমন্বয়ের সুযোগ আছে।”
অন্যদিকে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার কেন্দ্রীয় টেকনিক্যাল কমিটির দায়িত্বে থাকা ইউএফটিবি-এর রুবেল শেখ বলেন, “আমি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তরাই এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মাকসুদুল হক তালুকদার বলেন, “যদি কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়ে থাকে তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের আগেই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত ছিল। আমি বর্তমানে এখানে রুটিন দায়িত্বে আছি। ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং এ সংক্রান্ত প্রক্রিয়াগুলো সরাসরি তদারকি করেছেন শিক্ষা শাখার কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের জন্য তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।”
এ বিষয়ে উপ-রেজিস্ট্রার শহীদুল ইসলাম বলেন, মাদ্রাসা-কলেজ ভারসাম্য নীতি অনুযায়ী ভর্তি করানো হবে। প্রথম মেরিটে হয়তোবা এরকম পাওয়া যায়নি কিন্তু আগামী ম্যারিট থেকে এ শর্ত অনুযায়ী ভর্তি করানো হবে।
বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ইসলামী ও প্রচলিত আইনের সমন্বয়ে শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্য নিয়ে ২০০৩-০৪ শিক্ষাবর্ষে আইন ও শরিয়াহ অনুষদের অধীনে আল-ফিকহ্ বিভাগ চালু হয়। শুরুতে আরবিতে দক্ষ শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হলেও পরবর্তীতে ভর্তি পদ্ধতিতে একাধিক পরিবর্তন আনা হয়। ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে মাদ্রাসা ও কলেজ পটভূমির শিক্ষার্থীদের সমানসংখ্যক ভর্তির ব্যবস্থা চালু করা হলেও পরে গুচ্ছভিত্তিক উন্মুক্ত ভর্তি নীতির আওতায় সেই ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায়।
বিভাগের শিক্ষকদের দাবি, অনার্স ও মাস্টার্স মিলিয়ে প্রায় আড়াই হাজার নম্বরের আরবি ও ফিকহভিত্তিক কোর্স রয়েছে। আরবিতে তুলনামূলক দুর্বল শিক্ষার্থীরা এসব কোর্সে পিছিয়ে পড়ায় ফলাফল খারাপ হওয়া, রিটেক পরীক্ষার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সেশনজটের মতো সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে ৪০ জন মাদ্রাসা ও ৪০ জন কলেজ পটভূমির শিক্ষার্থীর জন্য আসন সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক বলেন, “বিভাগের অ্যাকাডেমিক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ শর্ত যুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ভর্তি কার্যক্রমে কেন তা অনুসরণ করা হচ্ছে না, সে বিষয়ে আমি অবগত নই।”
উল্লেখ্য, ১৯৭৭ সালে -এর নির্দেশে গঠিত -এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ধারা ১.২.১ ও ৫.১৪-এ ভর্তির ক্ষেত্রে জেনারেল ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সমানসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তির বিধান রাখা হয়েছিল। ১৯৮৮ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের ৫০ শতাংশ মাদ্রাসা থেকে নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। পাশাপাশি দুই ধারার শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথকভাবে ১০০ নম্বরের ইংরেজি অথবা আরবি ও ইসলামিয়াত পরীক্ষাও আবশ্যিক ছিল।
তবে সময়ের সঙ্গে সেই ভারসাম্য নীতি বিলুপ্ত হয়েছে। বর্তমানে ধর্মতত্ত্ব অনুষদেও জেনারেল ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫০ শতাংশ ভারসাম্য নীতি নেই। এমন পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র আল-ফিকহ্ অ্যান্ড ল’ বিভাগে নীতিটি পুনরায় কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হলেও চলমান ভর্তি কার্যক্রমে তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

