রাজশাহী প্রতিনিধি
উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ পাইকারি আমের বাজার রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বানেশ্বর আম হাট পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকাল ৯টার দিকে তিনি হাটে এসে বিভিন্ন আমের আড়ত, বিক্রয়কেন্দ্র ও পাইকারি লেনদেন কার্যক্রম ঘুরে দেখেন। সফরে তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের পলিটিক্যাল কাউন্সেলর এরিক গিলান, পলিটিক্যাল অফিসার চার্লস বেসনার্ডসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনকালে রাষ্ট্রদূত রাজশাহীর বিখ্যাত বিভিন্ন জাতের আম হিমসাগর (খিরসাপাত), ল্যাংড়া, আম্রপালি, ফজলি, গোপালভোগসহ মৌসুমের জনপ্রিয় আম সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। তিনি স্থানীয় ব্যবসায়ী, আড়তদার ও কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং সরাসরি বাগান থেকে আসা তাজা আমের স্বাদ গ্রহণ করেন।

বানেশ্বর আম হাট দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি আমের বাজার হিসেবে পরিচিত। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মণ আম এখানে বিক্রির জন্য আসে। মৌসুমজুড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা এই হাটে আম কিনতে আসেন।
সফর শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বলেন, “রাষ্ট্রদূত হিসেবে এটি আমার প্রথম রাজশাহী সফর। ২০২০ সালে একবার এখানে এসেছিলাম, তবে এবার বিশেষভাবে আমের মৌসুমে এসেছি। রাজশাহীর আমের সুনাম অনেক আগে থেকেই শুনেছি। উৎপাদনস্থলে এসে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলা এবং সরাসরি তাজা ফলের স্বাদ নেওয়ার অভিজ্ঞতা সত্যিই অসাধারণ।”
তিনি আরও বলেন, “আমি যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৃষিপ্রধান অঙ্গরাজ্য থেকে এসেছি। কৃষিপণ্য যেখানে উৎপাদিত হয়, সেখানে গিয়ে সেই পণ্যের প্রকৃত বৈচিত্র্য ও মান সম্পর্কে জানা যায়। রাজশাহীর আমের স্বাদ ও গুণগত মান আমাকে মুগ্ধ করেছে।”
মার্কিন রাষ্ট্রদূত জানান, আমেরিকানদের কাছেও আম অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ফল। তবে যুক্তরাষ্ট্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হিমায়িত বা প্রক্রিয়াজাত আম পাওয়া যায় এবং সেগুলো দিয়ে শেক ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য তৈরি করা হয়। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের মতো এত তাজা ও বৈচিত্র্যময় আম যুক্তরাষ্ট্রে সহজলভ্য নয়।
বাংলাদেশের আম রপ্তানি সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের আম আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বড় অবস্থান তৈরি করতে পারে। এজন্য উন্নত কোল্ড চেইন বা হিমাগারভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। সারা বছর আম সংরক্ষণ ও রপ্তানির সুযোগ তৈরি হলে কৃষকরা আরও লাভবান হবেন এবং বৈদেশিক বাজার সম্প্রসারণ সহজ হবে।”
কৃষি বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন, উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা গেলে রাজশাহীর আম বিশ্ববাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে। চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় প্রায় ১৯ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে আম চাষ হয়েছে এবং প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
হাটে উপস্থিত ব্যবসায়ী ও কৃষকরা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সফরকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, বিদেশি কূটনীতিকদের এমন পরিদর্শন রাজশাহীর আমের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং ভবিষ্যতে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে সহায়ক হবে।
স্থানীয়দের আশা, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভোক্তা বাজার যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক বাজারে রাজশাহীর আমের পরিচিতি আরও বাড়বে এবং কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবেন। রাষ্ট্রদূতের এই সফর সেই সম্ভাবনাকেই নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

