বান্দরবানের সীমান্তবর্তী উপজেলা নাইক্ষ্যংছড়ি দীর্ঘদিন ধরে মাদক চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ, অস্ত্র ও বিভিন্ন সীমান্ত অপরাধের কারণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে পরিচিত। মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন এই জনপদে একসময় চোরাকারবারী সিন্ডিকেটের তৎপরতা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করলেও সাম্প্রতিক সময়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার (২২ জুন) নাইক্ষ্যংছড়ি থানা পরিদর্শনে এসে চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (অ্যাডমিন অ্যান্ড ফিন্যান্স) মোঃ নাজমুল হক মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় তিনি সীমান্ত এলাকায় দায়িত্ব পালনে পেশাদারিত্ব, সতর্কতা ও জনসম্পৃক্ত পুলিশিংয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
সীমান্ত অপরাধ দমনে জোরালো অবস্থান স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক মাসে নাইক্ষ্যংছড়ি থানার উদ্যোগে মাদক পাচার, চোরাচালান, ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি গ্রেফতার এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী দোছড়ি, ঘুমধুম, তুমব্রু, বাইশারী ও সোনাইছড়ি এলাকার বিভিন্ন রুটে নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক অভিযানে ইয়াবা, আইস, গাঁজা এবং চোরাচালানকৃত বিভিন্ন পণ্য জব্দ হওয়ার ঘটনাও স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত ব্যবহার করে সক্রিয় থাকা কয়েকটি চোরাকারবারী চক্রের সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রমে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে।
ওসি মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে কার্যকর তৎপরতা
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নাইক্ষ্যংছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে থানার কার্যক্রমে গতিশীলতা বেড়েছে। সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জনগণের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ বৃদ্ধির কারণে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফলাফল দেখা যাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, আগে অনেক অপরাধী প্রকাশ্যে চলাফেরা করলেও বর্তমানে পুলিশের নজরদারি বৃদ্ধির কারণে তাদের তৎপরতা কমে এসেছে। মাদক ও চোরাচালানবিরোধী অভিযানে পুলিশের সক্রিয় উপস্থিতি সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়েছে।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সন্তোষ থানা পরিদর্শনের সময় বান্দরবানের পুলিশ সুপার খন্দকার ওয়াহাবুল হক নাইক্ষ্যংছড়ির সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, চলমান মাদকবিরোধী অভিযান এবং থানার বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে অতিরিক্ত ডিআইজিকে অবহিত করেন।
পরিদর্শন শেষে অতিরিক্ত ডিআইজি মোঃ নাজমুল হক থানার বিভিন্ন শাখার কার্যক্রম পর্যালোচনা করেন এবং পুলিশ সদস্যদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ এবং জনবান্ধব পুলিশিং কার্যক্রম নিয়ে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।
সীমান্ত নিরাপত্তায় সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন বিশেষজ্ঞদের মতে, নাইক্ষ্যংছড়ির মতো সীমান্তবর্তী এলাকায় শুধুমাত্র পুলিশের একক প্রচেষ্টায় অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে পুলিশ, বিজিবি, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
তাদের মতে, ওসি মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে চলমান অভিযান, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং জনসম্পৃক্ত পুলিশিং কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে মাদক ও চোরাচালান সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব হবে।
জনআস্থার নতুন ভিত্তি সীমান্ত এলাকায় অপরাধ দমন, মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার, চোরাকারবারী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক উন্নয়নের ফলে নাইক্ষ্যংছড়িতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, এই ধারা অব্যাহত থাকলে সীমান্ত জনপদ নাইক্ষ্যংছড়ি অপরাধমুক্ত ও নিরাপদ এলাকায় পরিণত হবে এবং পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।