বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাসে পা রাখা প্রতিটি প্রাণই এক একটি স্বপ্নীল গল্প। দূর-দূরান্ত থেকে যখন তোমরা এই ক্যাম্পাসে আসো, তখন তোমাদের চোখে থাকে এক বুক আশা, আর সাথে থাকে একটি মার্জিত ও ভদ্র পারিবারিক পরিচয়। সবাই অত্যন্ত চমৎকার, স্মার্ট এবং সুশিক্ষিত পরিবার থেকে এসেছ। তোমাদের মধ্যে অনেকেই স্কুল-কলেজের টপার, বোর্ডের সেরা মেধাবী। কিন্তু এই সুন্দর শুরুর আড়ালে একটা নির্মম সত্য লুকিয়ে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশাল স্রোত। এই স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে অনেক ব্রিলিয়ান্ট শিক্ষার্থী একটা সময়ে এসে হারিয়ে যায়, আর খুব অল্প কিছু মানুষই পারে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে।
আজ প্রায় তৃতীয় বর্ষে দাঁড়িয়ে, পেছনের দিনগুলোর অভিজ্ঞতার আলোকেই তোমাদের উদ্দেশ্যে কিছু বাস্তব কথা বলতে চাই। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিন থেকেই নিজের জীবনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা ‘গোল’ সেট করা সবচেয়ে জরুরি। তুমি ভবিষ্যতে নিজেকে কোথায় দেখতে চাও, সেটা আগে ঠিক করো। লক্ষ্যহীন নৌকা যেমন দিক হারিয়ে ফেলে, জীবনের লক্ষ্য না থাকলে তুমিও এই বিশাল ক্যাম্পাসে খেই হারিয়ে ফেলবে। আর একবার লক্ষ্য স্থির করার পর, সেটা অর্জনের জন্য নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু বিলিয়ে দিতে হবে, কারণ পরিশ্রম ও সততার কোনো বিকল্প নেই।
এর পাশাপাশি ক্যাম্পাস লাইফের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বন্ধু নির্বাচন। একজন ভালো বন্ধু যেমন তোমাকে টেনে তুলতে পারে, তেমনি একটি ভুল বন্ধুত্ব তোমার পুরো জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে। শুরুতে সবাইকে খুব আপন মনে হবে, সবাই খুব ভদ্র আচরণ করবে। কিন্তু মনে রাখবে, স্বার্থের এই দুনিয়ায় অনেকেই শুধু নিজের প্রয়োজনে তোমাকে ব্যবহার করতে চাইবে। এমন কিছু বন্ধুও জুটে যেতে পারে, যারা তোমাকে ধীর ধীরে বিভিন্ন নেশাদ্রব্যের বা এমন অন্যান্য অন্ধকার জগতের দিকে ঠেলে দেবে। এদের শুরুতে চেনা যায় না, এরা মুখোশ পরে ঘোরে। তাই বন্ধু নির্বাচনে সর্বোচ্চ সতর্ক হও। যে বন্ধু তোমাকে পড়াশোনায় অনুপ্রেরণা দেয়, বিপদে নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়ায়, তাকেই আপন করে নাও।
অনেক সময় দেখা যায়, স্কুল বা কলেজের মেধার অহংকার নিয়ে চলতে গিয়ে অনেকেই ভার্সিটির প্রথম সেমিস্টারেই পিছিয়ে পড়ে। তখন নিজের অজান্তেই মনে প্রশ্ন জাগে “কী মেধা নিয়ে স্কুল-কলেজ পার করলাম, আর আজ ভার্সিটি পার করতে পারছি না কেন?” পড়াশোনা কঠিন মনে হতে শুরু করে। এর একমাত্র কারণ হলো পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বা ‘ফ্লো’ নষ্ট হওয়া। তাই প্রথম বর্ষের প্রথম দিন থেকেই পড়াশোনার একটা ছন্দ ধরে রাখতে হবে। আমি বলছি না যে তোমরা সারাদিন শুধু বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন উপভোগ করার জন্য, আড্ডা দেওয়ার জন্য, নতুন নতুন স্মৃতি তৈরি করার জন্য। কিন্তু সবকিছুর একটা নির্দিষ্ট সময় আছে।
আমার সহজ সূত্র হলো: “যাই কিছু হয়ে যাক না কেন, পড়াশোনার সময় পড়াশোনা, বাকি সময় অন্য কিছু।” পড়াশোনা আর এনজয়মেন্টের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলেই ক্যাম্পাস লাইফ সুন্দর হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো করতে হলে শিক্ষক এবং সিনিয়রদের সাথে সুসম্পর্ক বা ভালো কানেকশন রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে যেসব সিনিয়র পড়াশোনায় খুব পারদর্শী এবং যাদের ক্যারিয়ার সচেতনতা ভালো, তাদের সাথে যোগাযোগ রাখো। তাদের থেকে পরামর্শ নাও কীভাবে পড়তে হবে, কোন রিসোর্সগুলো ফলো করতে হবে, ল্যাব বা থিসিস কীভাবে করতে হয়। বড় ভাই হিসেবে তাদের অভিজ্ঞতা তোমাদের পথ চলাকে অনেক সহজ করে দেবে।
সবশেষে, সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা সব পরিস্থিতিতেই সর্বদা সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। অহংকার মানুষকে ধ্বংস করে দেয়, আর কৃতজ্ঞতাবোধ মানুষকে বিনয়ী ও মানসিকভাবে শান্ত রাখে। মনে রাখবে, তুমি আজ যেখানে আছ, তা অনেকেরই স্বপ্ন। তাই প্রতিনিয়ত সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাও, এটি তোমাকে মানসিকভাবে শক্ত রাখবে এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে সঠিক পথে চলার শক্তি জোগাবে।
নবীন বন্ধুদের উদ্দেশ্যে আমার শেষ কথা: তোমরা যবিপ্রবিতে এসেছ নিজেদের একটা অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে, হারিয়ে যেতে নয়। স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়া খুব সহজ, কিন্তু স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের মেধা, সততা আর লক্ষ্য টিকিয়ে রাখাটাই আসল কৃতিত্ব। আশা করি, তোমরা প্রথম দিন থেকেই সচেতন থাকবে, সঠিক বন্ধু বেছে নেবে এবং নিজের স্বপ্নের প্রতি সৎ থাকবে।
তোমাদের সবার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন সাফল্যে ও আনন্দে ভরে উঠুক। ক্যাম্পাস জুড়ে তোমাদের জন্য রইল একরাশ শুভকামনা ও স্বাগত সম্ভাষণ! মাহফুজুল ইসলাম ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন বায়োসায়েন্স বিভাগ, ৩য় বর্ষ যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি)

