১২৮ স্থানে পাহাড় ধ্বস; সেতু ভেঙে রাঙ্গামাটি-বান্দরবান যোগাযোগ বন্ধ

রাঙ্গামাটিতে টানা ৭ দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেলার ১২৮টি স্থানে পাহাড় ধ্বসের ঘটনা ঘটে। এছাড়াও রাঙ্গামাটি-বান্দবান সড়কে সেতু ভেঙে দু’জেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

জেলা প্রশাসন ও সড়ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ( ১১ জুলাই) পর্যন্ত জেলার অন্তত ১২৮ জায়গায় ছোট-বড় পাহাড় ধ্বসের ঘটনা ঘটেছে।১২৮ পাহাড় ধ্বসের ঘটনার অন্যতম হলো- “কাপ্তাই উপজেলায় ১৫টি, বাঘাইছড়িতে ৩টি, কাউখালীতে ৩০টি, রাঙামাটি সদরে ১১টি, নানিয়ারচরে ২টি এবং বিলাইছড়িতে ৩৭টি। সহসা ভারি বর্ষণ না থামলে, ৯৮টি স্থানের মতো আরও অনেক স্থানে ভয়াবহ পাহাড় ধ্বসের ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছে। ব্যাপক পাহাড় ধ্বসের ঘটনায় জেলার বিভিন্ন সড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং কয়েকটি এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন জেলার ১০ উপজেলায় ২১২টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। এর মধ্যে বর্তমানে ৩৪টি আশ্রয় কেন্দ্রে মোট ৪ হাজার ২৬৬ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রিতদের জন্য তিন বেলা খাবার সহ প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করছে জেলা প্রশাসন।

আবহাওয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে পাহাড় ধ্বস, জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন।

জনগণকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলার এবং অপ্রয়োজনে পাহাড়ি ঢলের মধ্যে চলাচল না করা সংক্রান্ত প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানান। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং জরুরি পুনর্বাসন কার্যক্রম গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এদিকে উজানের পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে বান্দরবান–রাঙ্গামাটি সড়কের ব্রিজঘাট সেতুর একটি বড় অংশ ধসে পড়ায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে জরুরি রোগী পরিবহন, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দূরপাল্লার যানবাহন বিকল্প পথ ব্যবহার করতে বাধ্য হলেও অনেক এলাকায় বিকল্প সড়ক না থাকায় ভোগান্তি আরও বেড়েছে। স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এই এলাকায় পাহাড়ি ঢলের কারণে একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও স্থায়ী প্রতিরোধমূলক কোন ব্যবস্থা না থাকায়, মানুষের দুর্ভোগ কমছে না। তারা দ্রুত বেড়িবাঁধ পুনর্নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত সেতু সংস্কার বা নতুন সেতু নির্মাণের দাবি জানায়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজস্থলী প্রেস ক্লাবের সাধারন সম্পাদক মো. সুমন বলেন, রাতভর বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে হঠাৎ করেই বাঁধ ভেঙে যায়। সকালে উঠে দেখি চারদিকে শুধু পানি। ঘরবাড়ি, ফসল সবই ক্ষতির মুখে পড়েছে। রাঙামাটি-বান্দরবান সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। ভারী বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ী ঢলের তীব্র স্রোতে সৃষ্ট বন্যায় রাঙামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলাধীন ফারুয়া বাজার ডুবে গেছে। এতে কমবেশি দেড়শ দোকানপাট ও ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে।

বান্দরবান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফা সুলতানা খান হীরামনি বলেন, আমি নিজেও পরিবার নিয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছি। সেতুটির বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি।

ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের সুখবিলাস দুধপুকুরিয়া এলাকার রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ধসে যাওয়ায় ওই এলাকাসহ রাঙ্গামাটি রাজস্থলী উপজেলার বেশ কিছু এলাক প্লাবিত হয়ে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে।

জেলার আশ্রয় কেন্দ্র সমূহে দুর্গত মানুষ অবস্থান করছেন। তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও দূর্গতদের ত্রাণ ও খাদ্য পৌঁছে দিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সাবেক মন্ত্রী এডভোকেট দীপেন দেওয়ান এমপি বরকল উপজেলা সহ একাধিক স্থানের আশ্রয় কেন্দ্র ঘুরে দেখেছেন। পরিস্থিতি
সার্বিক তত্ত্বাবধান ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সমন্বিত ভাবে কাজ করছে।

রাঙ্গামাটি সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা জানান, বান্দরবান–রাঙামাটি সড়কের ব্রিজঘাট সেতুর এক পাশের বড় অংশ ধসে পড়ায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে জানান। ঘটনাস্থল বান্দরবান সড়ক বিভাগের নিয়ন্ত্রণে। দ্রুত সময়ে বেইলি ব্রিজ স্থাপনের বিকল্প নেই বলে যোগ করেন এ কর্মকর্তা।

রাঙ্গামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. তারেক সেকান্দার বলেন, পুলিশ বাহিনীও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে মাঠে কাজ করছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

রাঙ্গামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মুহাম্মদ ইমরানুল হক ভূঁইয়া বলেন, অনেক জায়গায় ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড় ধ্বসের ঘটনা ঘটছে।প্রাণহানির ঝুঁকি এড়াতে সকলকে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসার আহ্বান জানান এ কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন