মেডিকেলে সুযোগ পেয়েও অর্থসংকটে অনিশ্চিত মাহমুদার স্বপ্ন, পাশে দাঁড়ালেন বিএনপি নেতা

দারিদ্র্য কখনো মেধার কাছে হার মানে, আবার কখনো সেই মেধার পথেই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় অর্থাভাব। রাজশাহীর তানোর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের চা বিক্রেতার মেয়ে মাহমুদা খাতুনের জীবনগল্প যেন সেই বাস্তবতারই এক জীবন্ত উদাহরণ।

অদম্য অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রম আর সীমাহীন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ অর্জন করেছেন মাহমুদা। কিন্তু চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নপূরণের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অর্থসংকট যেন তার সামনে নতুন এক অনিশ্চয়তার দেয়াল তুলে দিয়েছে।

তানোর উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা মাহমুদা সম্প্রতি জামালপুর সরকারি মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছেন। ইতোমধ্যে তার ক্লাসও শুরু হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় বই, শিক্ষা উপকরণ ও হোস্টেল খরচ জোগাড় করতে না পারায় প্রতিদিনই উদ্বেগ আর হতাশার সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে তাকে।

মাহমুদার বাবা মাসুদ রানা গ্রামের একটি ছোট চায়ের দোকান চালিয়ে সংসার চালান। প্রতিদিনের আয় মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। সেই সামান্য আয়ে চার সদস্যের পরিবারে নিত্যদিনের চাহিদা মেটাতেই হিমশিম খেতে হয়। পরিবারের বসবাস মাত্র দুই শতক জমির ওপর একটি কাঁচা ঘরে। আবাদি জমি বা অন্য কোনো আয়ের উৎসও নেই।

তবে অভাব কখনো মাহমুদার স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। নিয়মিত কোচিং কিংবা প্রাইভেট পড়ার সুযোগ না থাকলেও তিনি কখনো হাল ছাড়েননি। অনেক সময় সহপাঠীদের কাছ থেকে বই ধার করে রাত জেগে পড়াশোনা করেছেন। সেই নিরলস প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ ২০২৩ সালে কৃষ্ণপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০২৫ সালে কৃষ্ণপুর আদর্শ মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেন তিনি।

মেয়ের সাফল্যে গর্বিত হলেও ভবিষ্যতের খরচের হিসাব কষে আজ দিশেহারা বাবা মাসুদ রানা। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন,“আমরা নিজেরা লেখাপড়া জানি না। কিন্তু মেয়ের চোখে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছি। অনেক কষ্ট করে তাকে পড়িয়েছি। মেডিকেলে সুযোগ পাওয়ার খবর আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ ছিল। কিন্তু এখন সেই আনন্দের সঙ্গে যোগ হয়েছে অসহায়ত্ব। ভর্তির প্রায় ১৩ হাজার টাকা ধার করে জোগাড় করতে হয়েছে। সামনে কীভাবে খরচ চালাব, জানি না।”

তিনি জানান, প্রথম বর্ষের প্রয়োজনীয় বই কিনতেই প্রায় ২০ হাজার টাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি অ্যানাটমি শিক্ষার জন্য একটি কঙ্কাল (স্কেলেটন) কিনতে প্রায় ৪০ হাজার টাকা লাগবে। এছাড়া প্রতি মাসে হোস্টেল, খাবার ও অন্যান্য শিক্ষা ব্যয় মিলিয়ে প্রয়োজন হবে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা।

মাহমুদার মা সায়েরা বিবিও মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকেই মেয়েটার স্বপ্ন ডাক্তার হওয়ার। মানুষের সেবা করার জন্য সে অনেক কষ্ট করেছে। সমাজের বিত্তবান মানুষদের কাছে আমাদের একটাই আবেদন মেয়েটার স্বপ্ন যেন অর্থের অভাবে থেমে না যায়।”

বর্তমানে কলেজ হোস্টেলে অবস্থান করছেন মাহমুদা। কিন্তু ক্লাস শুরু হওয়ার পরও নিজের প্রয়োজনীয় বই কিনতে পারেননি তিনি।

চোখে স্বপ্ন আর কণ্ঠে হতাশার সুর নিয়ে মাহমুদা বলেন,
“আমি ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করতে চাই। কিন্তু বই কেনার টাকাও জোগাড় করতে পারছি না। ক্লাসে সবাই বই নিয়ে পড়ছে, আর আমি অন্যদের বই দেখে পড়ার চেষ্টা করছি। অনেক ভয় হয় অর্থের অভাবে আমার স্বপ্নটা যেন হারিয়ে না যায়।”

মাহমুদার এই সংগ্রামের কথা জানতে পেরে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বিএনপি নেতা সুলতানুল ইসলাম তারেক। রোববার বিকেলে তিনি মাহমুদার পরিবারের হাতে আর্থিক সহায়তা তুলে দেন এবং ভবিষ্যতেও পাশে থাকার আশ্বাস দেন।

তিনি বলেন,“মাহমুদা শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো তানোরের গর্ব। এমন মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানো আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। তার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে আমি সবসময় সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।”

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মাহমুদার মতো মেধাবী শিক্ষার্থীরা দেশের সম্পদ। অর্থের অভাবে যেন কোনো স্বপ্ন ঝরে না যায়, সেজন্য সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ করেও যে মেধা ও স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা যায়, মাহমুদা তার উজ্জ্বল উদাহরণ। এখন শুধু প্রয়োজন একটু সহযোগিতা, একটু মানবিকতা। সমাজের সম্মিলিত সহায়তা পেলে হয়তো একদিন এই চা বিক্রেতার মেয়েই সাদা অ্যাপ্রোন গায়ে মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করবেন এমন স্বপ্নই দেখছে তার পরিবার, শিক্ষক এবং পুরো তানোরবাসী।

আরও পড়ুন